Online Update

Keep in touch for online update.
পরীক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যের জন্য রয়েছে অনলাইন আপডেট। ফেসবুক ফ্যানপেজ-এর কুইজে অংশগ্রহন করতে লগ-ইন কর facebook.com/Panjeree। কুইজে অংশগ্রহন করে প্রতি সপ্তাহে জিতে নাও আকর্ষনীয় পুরষ্কার।

ঝরে পড়া রোধে কার্যকর দাওয়াই মাল্টিগ্রেড পদ্ধতি


 
প্রাথমিক পার হওয়ার আগেই নানা কারণে স্কুল থেকে ঝরে পড়ে শিক্ষার্থীরা। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য মাল্টিগ্রেড পদ্ধতির খবর জানাচ্ছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক
‘থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগত্টাকে, কেমন করে ঘুরছে মানুষ...’ দূর থেকেই কানে ভেসে আসছিল কাজী নজরুলের ‘সংকল্প’ কবিতাটি। কাছে গিয়ে দেখা গেল, টিনশেড একটি ঘরে বিভিন্ন বয়সী ২৫ জনের মতো শিক্ষার্থী। ছোট ছোট চার-চারটি দলে ভাগ হয়ে বসেছে তারা। এ শিক্ষার্থীদেরই একটি দল আবৃত্তি করছিল কবিতাটি। অন্যদের দেখা গেল, আকাআঁকি-লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। কেউ আবার কোনো কিছু বুঝতে না পারলে শিক্ষককে জিজ্ঞেস করছে, ‘ম্যাডাম এটা কী?’ ম্যাডামও হাসিমুখেই বুঝিয়ে দিচ্ছেন সব। জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার একটি স্কুলের চিত্র এটি। স্কুলটিতে মাল্টিগ্রেড পদ্ধতিতে পড়ানো হয়। 
 
মাল্টিগ্রেড পদ্ধতি
একই শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পাঠ পরিক্রমার একটি ব্যবস্থা হলো মাল্টিগ্রেড। মূলত সুবিধাবঞ্চিত স্কুলবহির্ভূত শিশুদের শিক্ষার ম–ল স্রোতে আনার জন্যই এ ব্যবস্থা। এটি ব্যয়সাশ্রয়ী হওয়ায় দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া এলাকায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ঢাকা আহছানিয়া মিশনের ইএফএলই সমন্বয়ক বদরুন সেরিনা জানালেন, ‘এই পদ্ধতিতে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বা পর্যায় অনুযায়ী দলগতভাবে পাঠ পরিচালনা করে থাকেন। অর্থাৎ একজন শিক্ষক একই সঙ্গে একের অধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ান। ফলে শিক্ষককে শিক্ষার্থী সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হয়। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে ওঠে। যেটা পাঠের ক্ষেত্রে খুবই কাজে দেয়।’
এ পদ্ধতিতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতার সর্বশেষ অবস্থা চিহ্নিত করে শিক্ষক সে অনুযায়ী সহায়তা দেন। শিক্ষার্থীরা গতানুগতিক মুখস্থের পরিবর্তে বিভিন্ন উপকরণের সাহায্যে একা একা, জোড়ায় জোড়ায় কিংবা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কাজ করে। ফলে তারা দ্রুত ঘাটতিগুলো কাটিয়ে ওঠার মাধ্য মে শ্রেণিভিত্তিক নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয়। শিক্ষার্থীরা কাজ করে করে শিখতে অভ্যস@ হয়ে ওঠে। ফলে তাদের শিখন হয়ে ওঠে স্থায়ী, যা শিক্ষার্থীকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
যেভাবে পড়ানো হয়
একজন শিশু স্কুলে ভর্তির পরপরই তার প্রারম্ভিক দক্ষতা যাচাই করা হয়। বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অনুযায়ী তাকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো—প্রারম্ভিক, অগ্রগামী, দক্ষ ও স্বাধীন। একজন শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে ক্লাস রুটিন অনুযায়ী যখন যে বিষয়ের ক্লাস সে বিষয়ে তার দক্ষতা-পর্যায় অনুযায়ী দলগতভাবে শিক্ষা গ্রহণ করে। দলগতভাবে শিখন কাজ পরিচালনার জন্য শিখনকেন্দ্রে চারটি টেবিল ব্যবহার করা হয়। যাতে শিক্ষার্থীরা বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতানুযায়ী বিভিন্ন দলে বসে টেবিলে কাজ করতে পারে। প্রতিটি দলে দলনেতা নির্বাচন করা হয়। পর্যায়ক্রমে দলের প্রত্যেকেই দলনেতা হওয়ার সুযোগ পায়। প্রতিদিন তিন ঘণ্টা ধরে শিখন-শিক্ষণ কাজ চলে। নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীদের শিখনের জন্য শিক্ষক মূলত পাঁচটি কাজ করেন। এগুলো হলো—পর্ব পাঠ যাচাই, পড়ালেখা, চর্চা ও মূল্যায়ন (প্রারম্ভিক দক্ষতা যাচাই, সাপ্তাহিক মূল্যায়ন, মাসিক মূল্যায়ন ও ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন)। এসব শিক্ষার্থী পরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।   
জামালপুর থেকেই শুরু
জামালপুর জেলায় ঝরে পড়া তিন হাজার শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে ৭৫টি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ঢাকা আহছানিয়া মিশন যৌথভাবে এর উদ্যোক্তা। ২০১৭ সালের মধ্যে এসব কেন্দ্রে তিন হাজার শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। ড্যাম-ম্যারিকো চিলড্রেন লার্নিং সেন্টার নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এসব শিশুকে শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জামালপুরকেই কেন বেছে নিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে আহছানিয়া মিশনের নির্বাহী পরিচালক ড. এম এহসানুর রহমান বলেন, ‘জামালপুর জেলায় শিক্ষার হার খুব কম। এ কারণে জামালপুরকেই প্রথমে বেছে নেওয়া হয়েছে।’
ম্যারিকো বাংলাদশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অপারেশনস) ও কান্ট্রি হেড আদিত্য সোম বলেন, ‘প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ের অনেক শিশু বিদ্যালয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত। যেসব শিশু কখনো বিদ্যালয়ে যায়নি অথবা কোনো কারণে ঝরে পড়েছে, তাদের সবাইকে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসাই হলো ড্যাম-ম্যারিকো চিলড্রেন লার্নিং সেন্টার প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য। মাল্টিগ্রেড পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা তাদের মেধা ও দক্ষতা অনুযায়ী প্রতিটি গ্রেডে ৯ মাসের শিক্ষণ লাভ করবে।’
ঢাকা আহছানিয়া মিশনের এডুকেশন প্রোগ্রামের টিম লিডার সাহিদুল ইসলাম জানালেন, এখন দেশের ২৬টি জেলার ৭২টি উপজেলায় আমাদের চার হাজার শিক্ষাকেন্দ্র আছে, যেখানে মাল্টিগ্রেড পদ্ধতিতে পড়ানো হয়। এখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তার বয়স, বুদ্ধি, সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষা প্রদান করা হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একেকটা ধাপ শেষ করতে এক বছর সময় লাগে। এখানে ৮-৯ মাসের মধ্যেই শিশু তার যোগ্যতা অনুযায়ী ধাপ পরিবর্তন করতে পারে। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুকে আবার ম–লধারার শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা।’ তিনি আরো যোগ করেন, এখানে ভর্তি হওয়া  বাচ্চারা চাইলে যেকোনো সময় আবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফেরত যেতে পারে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার দক্ষতা অর্জন করলে শিক্ষার্থীকে আমরা কাছাকাছি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিই। যেখান থেকে সে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয়। গত বছর এ রকম ৩১১ জন শিশু পিএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে সবাই।’
শিক্ষার্থী বাছাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে আহছানিয়া মিশনের রিজিওনাল ম্যানেজার তপন কুমার সরকার জানালেন, আমরা প্রথমে ওয়ার্ডভিত্তিক জরিপ করে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার কেমন। আর্থিক অসচ্ছলতা, স্থানান্তরিত হওয়া, পরীক্ষাভীতিসহ নানা কারণে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ে কিংবা স্কুলে যায় না। এরপর ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের  অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলি। অভিভাবকদের বুঝিয়ে বাচ্চাদের শিক্ষাকেন্দ্রে আনা হয়। একেকটি কেন্দ্রে ৩০ জন বাচ্চাকে ভর্তি করানো হয়। একজন করে নারী শিক্ষক থাকেন। তিনি দৈনিক তিন ঘণ্টা বাচ্চাদের শেখান। মাল্টিগ্রেড পদ্ধতি শেখানো হয় বলে এখানে বাচ্চাদের পড়া নিয়ে ভয়ডর আর থাকে না। আর যেকোনো কিছু শিশু নিজে করে করে শেখে।
ফলে শিক্ষাটা তার জীবনে স্থায়ী হয়। জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার একটি কেন্দ্রের শিক্ষক মরিয়ম বেগম জানালেন, ‘বেশির ভাগ বাচ্চাকেই দেখেছি, তাদের মনে পড়াশোনা নিয়ে একটা অহেতুক ভয় কাজ করে। প্রথমে চেষ্টা করি পড়ালেখা নিয়ে বাচ্চাদের মনের ভীতি দ–র করতে। কারণ ভয় থাকলে সে আর পড়ায় মনোযোগ দিতে পারবে না। অনেক বাচ্চাকেই বলতে শুনেছি, আগে স্কুলে যেতে ভয় লাগত, এখন স্কুল যেদিন বন্ধ থাকে সে দিনটিই আর ভালো লাগে না।’
আরেকজন শিক্ষক সাবরিনা খাতুন বললেন, ‘আমরা বাচ্চাদের হাতে-কলমে শেখাই। প্রতিটি বাচ্চা সম্পর্কে আগে শিক্ষককে অবহিত হতে হয়। ফলে প্রত্যেকের সমস্যা নিয়ে আলাদা করে ভাবার সুযোগ থাকে। আর বাচ্চারাও হাসি-গান-আনন্দের মধ্য দিয়ে শিখতে পারে।’
 

Related Updates